চাকরির বাজারে শুধু পড়াশোনা থাকলেই এখন অনেক সময় কাজ পাওয়া সহজ হয় না। কোন কাজের জন্য কী ধরনের দক্ষতা দরকার, সেই অনুযায়ী নিজেকে তৈরি করাটাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আর সেই জায়গাতেই দেশের যুবকদের জন্য কাজে আসতে পারে কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী কৌশল বিকাশ যোজনা বা PMKVY।
২০১৫ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মাধ্যমে এতদিনে দেশের ১.৬৪ কোটির বেশি যুবক-যুবতী প্রশিক্ষণ বা ওরিয়েন্টেশন পেয়েছেন। ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১.৬৪ কোটি এবং ১.২৯ কোটি প্রার্থী সার্টিফায়েড হয়েছেন বলে কেন্দ্র জানিয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পের PMKVY 4.0 সংস্করণ চালু রয়েছে।
তবে একটা বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করে রাখা দরকার। PMKVY-তে প্রশিক্ষণ নেওয়া মানেই সরাসরি সরকারি বা বেসরকারি চাকরি নিশ্চিত—এমন কোনও প্রতিশ্রুতি এই প্রকল্পের নেই। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কাজের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি, মূল্যায়ন ও সার্টিফিকেশনের সুযোগ দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য।
PMKVY আসলে কী?
PMKVY হল কেন্দ্রীয় দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোগ মন্ত্রক (MSDE)-এর অধীনে পরিচালিত একটি জাতীয় স্কিলিং প্রকল্প। এর মাধ্যমে বিভিন্ন পেশা ও শিল্পক্ষেত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রকল্পের বর্তমান সংস্করণ PMKVY 4.0-কে আগের তুলনায় আরও বেশি শিল্পের চাহিদাভিত্তিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর করে সাজানো হয়েছে। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতার জন্য কিছু কোর্সে On-the-Job Training বা OJT-ও রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ, শুধু ক্লাস করে সার্টিফিকেট নেওয়ার বদলে কাজের পরিবেশে প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরির দিকেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
কারা এই প্রশিক্ষণ নিতে পারেন?
PMKVY 4.0-এর নিয়ম অনুযায়ী সাধারণ Short-Term Training এবং Special Projects-এর ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সি ভারতীয় নাগরিকদের লক্ষ্য করা হয়েছে। বিশেষ করে স্কুল বা কলেজের পড়াশোনা শেষ না করা, শিক্ষার বাইরে থাকা এবং বেকার যুবক-যুবতীদের প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগোষ্ঠীর মধ্যে রাখা হয়েছে।
তবে প্রতিটি কোর্সের নিজস্ব যোগ্যতার শর্ত থাকতে পারে। তাই শুধু বয়স মিললেই যে সব কোর্সে ভর্তি হওয়া যাবে, এমন নয়।
Recognition of Prior Learning বা RPL-এর ক্ষেত্রে আবার যাঁদের আগে থেকেই কোনও কাজের অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা রয়েছে, তাঁদের সেই দক্ষতার মূল্যায়ন করে সার্টিফিকেশনের সুযোগ দেওয়া হয়। এই অংশে বয়সসীমাও আলাদা হতে পারে।
কী কী ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়?
PMKVY 4.0-এ মোটামুটি তিন ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।
১. Short-Term Training
যাঁরা নতুন করে কোনও পেশাগত দক্ষতা শিখতে চান, তাঁদের জন্য এই প্রশিক্ষণ। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী এই ধরনের কোর্স সাধারণত ৩০০ থেকে ৬০০ ঘণ্টার মধ্যে হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু কোর্সের সময় আরও বেশি হতে পারে।
এই প্রশিক্ষণের সঙ্গে কাজের জায়গায় বাস্তব অভিজ্ঞতা দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকতে পারে। ফলে কোর্স শেষ করার পর শেখা বিষয়টি বাস্তবে কীভাবে ব্যবহার করা হয়, সেটিও বোঝার সুযোগ থাকে।
২. Recognition of Prior Learning বা RPL
অনেকেই কোনও কলেজ বা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে না পড়েও বছরের পর বছর একটি কাজ করে দক্ষ হয়ে ওঠেন। কিন্তু সেই দক্ষতার কোনও আনুষ্ঠানিক সার্টিফিকেট থাকে না।
RPL-এর মাধ্যমে এই ধরনের প্রার্থীদের আগের শেখা বা কাজের দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয়। নির্দিষ্ট মান পূরণ করলে সেই দক্ষতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা সার্টিফিকেশন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। প্রয়োজনে আরও দক্ষতা বাড়ানোর প্রশিক্ষণও নেওয়া যায়।
৩. Special Projects
কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, বিশেষ পরিস্থিতি বা সাধারণ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার বাইরে থাকা প্রয়োজনের জন্য Special Projects রাখা হয়েছে।
এর মধ্যে ভবিষ্যতের চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় কিছু নতুন ধরনের দক্ষতার প্রশিক্ষণও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। কিছু প্রকল্প আবাসিক বা অনাবাসিক—দুই ধরনেরই হতে পারে।
AI থেকে ড্রোন, নতুন কোর্সেও সুযোগ
PMKVY-এর বর্তমান পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে নতুন প্রযুক্তির দিকে। শুধু প্রচলিত কাজের প্রশিক্ষণ নয়, ভবিষ্যতে যেসব ক্ষেত্রে কর্মীর চাহিদা বাড়তে পারে, সেই ধরনের কোর্সও যুক্ত করা হচ্ছে।
কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, PMKVY 4.0-এর অধীনে ৬০০-র বেশি নতুন-প্রজন্মের কোর্স চালু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- Artificial Intelligence বা AI
- Robotics
- Drone Technology
- 5G
- Internet of Things বা IoT
- Semiconductor
- Solar Energy
- 3D Printing বা Additive Manufacturing
- Green Energy-র বিভিন্ন ক্ষেত্র
৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত নতুন ও ভবিষ্যতমুখী এই ধরনের ক্ষেত্রে প্রায় ৫.৪৪ লক্ষ প্রার্থী প্রশিক্ষণ পেয়েছেন বলে কেন্দ্র জানিয়েছে।
ফলে যাঁরা শুধু প্রচলিত কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চান না, তাঁদের জন্যও নতুন ধরনের কোর্স বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রশিক্ষণের জন্য কি টাকা দিতে হবে?
PMKVY-এর অধীনে অনুমোদিত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থায়নে প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন ও সার্টিফিকেশনের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে কোন কোর্সে কী সুবিধা পাওয়া যাবে, তা সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ ও প্রকল্পের নিয়মের উপর নির্ভর করে।
তাই কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান PMKVY-এর নাম করে আলাদা টাকা চাইলে আগে সেটি সরকারি প্ল্যাটফর্মে যাচাই করে নেওয়া উচিত।
প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল করার জন্য Skill India Digital প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হচ্ছে। PMKVY 4.0-এর ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে সার্টিফিকেশন ও প্রশিক্ষণ-পরবর্তী ট্র্যাকিং পর্যন্ত ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালনার কথা সরকারি নির্দেশিকায় রয়েছে।
কোথায় গিয়ে কোর্স খুঁজবেন?
বর্তমানে Skill India Digital Hub-এ বিভিন্ন স্কিল কোর্স, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং সংশ্লিষ্ট সুযোগ খোঁজার ব্যবস্থা রয়েছে।
প্ল্যাটফর্মে নিজের আগ্রহ ও শিক্ষাগত অবস্থার ভিত্তিতে কোর্স খোঁজা যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গায় থাকা Skill Centre সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া যায়।
তাই কোনও সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট দেখে সরাসরি টাকা জমা না দিয়ে আগে সরকারি Skill India Digital প্ল্যাটফর্মে কোর্সটির নাম, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং যোগ্যতার বিষয়গুলি মিলিয়ে দেখা ভালো।
আধার দিয়ে পরিচয় যাচাই হতে পারে
PMKVY 4.0-এর ক্ষেত্রে বৈধ Aadhaar থাকা প্রার্থীদের যোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সরকারি নির্দেশিকায় প্রার্থীদের পরিচয় যাচাই এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় আধার-ভিত্তিক প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে উপস্থিতি নথিভুক্ত করার জন্য Aadhaar Enabled Biometric Attendance System বা AEBAS ব্যবহারের ব্যবস্থাও রয়েছে।
তবে নির্দিষ্ট কোর্সে ভর্তি হওয়ার আগে সেই কোর্সের নিজস্ব eligibility criteria দেখে নেওয়া প্রয়োজন।
প্রশিক্ষণ নিলেই কি চাকরি হবে?
এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। PMKVY-কে এমন কোনও প্রকল্প হিসেবে দেখা ঠিক নয় যেখানে প্রশিক্ষণ শেষ করলেই চাকরি নিশ্চিত হয়ে যাবে।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হল যুবকদের শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ করে তোলা এবং তাঁদের বিভিন্ন কর্মজীবনের পথের জন্য প্রস্তুত করা। PMKVY 4.0-এ OJT এবং কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানোর উপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রের ২০২৬ সালের একটি স্বাধীন মূল্যায়ন সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, PMKVY-এর Short-Term Training প্রার্থীদের মধ্যে প্রশিক্ষণের আগে কর্মরত বা স্বনিযুক্ত থাকার সম্মিলিত হার ২৬.৬ শতাংশ থেকে প্রশিক্ষণের পরে ৪৫.৪ শতাংশে উঠেছিল। তবে এটি মূল্যায়নে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের ফলাফল; প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীর ক্ষেত্রে একই ফল হবে—এমন দাবি করা যায় না।
আবেদন করার আগে যে বিষয়টি মাথায় রাখবেন
PMKVY-তে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী কোর্স বেছে নেওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য কোনও কোর্সে ভর্তি না হয়ে ভবিষ্যতে কোন ধরনের কাজ করতে চান, সেই অনুযায়ী প্রশিক্ষণ বেছে নেওয়া বেশি কার্যকর হতে পারে।
বিশেষ করে AI, ড্রোন, ইলেকট্রনিক্স, সৌরশক্তি, সেমিকন্ডাক্টর বা সাইবার-সংক্রান্ত কোর্সে ভর্তি হওয়ার আগে কোর্সের মেয়াদ, যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং সার্টিফিকেশনের নিয়ম দেখে নেওয়া উচিত।
বর্তমানে কেন্দ্রের Skill India Digital Hub-এ কোর্স ও Skill Centre খোঁজার সুবিধা রয়েছে। তাই কোনও অচেনা ওয়েবসাইট বা ব্যক্তির মাধ্যমে ভর্তি হওয়ার আগে সরকারি প্ল্যাটফর্মে তথ্য যাচাই করাই নিরাপদ।
এক নজরে PMKVY
প্রকল্পের নাম: প্রধানমন্ত্রী কৌশল বিকাশ যোজনা (PMKVY)
বর্তমান সংস্করণ: PMKVY 4.0
পরিচালনাকারী মন্ত্রক: Ministry of Skill Development and Entrepreneurship
লক্ষ্য: দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের উপযোগী দক্ষতা তৈরি
সাধারণ বয়সসীমা: ১৫–৪৫ বছর
প্রশিক্ষণের ধরন: Short-Term Training, RPL ও Special Projects
প্রশিক্ষণ: বিভিন্ন শিল্প ও নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষেত্রে
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম: Skill India Digital
২০১৫ থেকে প্রশিক্ষণ/ওরিয়েন্টেশন: ১.৬৪ কোটির বেশি
নতুন-প্রজন্মের কোর্স: ৬০০-র বেশি
দেশে চাকরির ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি করাই এখন অনেকের কাছে বড় বিষয়। PMKVY সেই জায়গায় প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন এবং সার্টিফিকেশনের একটি সরকারি সুযোগ তৈরি করছে। তবে কোন কোর্সটি একজনের জন্য উপযোগী হবে, সেটি নির্ভর করবে তাঁর বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আগের অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যতের কাজের লক্ষ্য অনুযায়ী।







